বিক্রম মুভি রিভিউ

বহুলপ্রতিক্ষিত তামিল মুভি বিক্রম। যা নিয়ে আমার মতো সকলের মনেই ছিলো নানা জল্পনা কল্পনা। মুভিটির ট্রেইলার প্রকাশ হবার পর থেকেই রীতিমত ট্রেন্ডিং টপিক হয়ে ছিলো মুভিটি। এটি একটি মাল্টিস্টারার ফিল্ম। কেমন হবে, সবাইকে স্ক্রীনে কেমন ভাবে উপস্থাপন করবে, সবারকে যথার্থ মূল্যায়ন করতে পারবে কিনা। যাই হোক মূল বিষয়ের দিকে যাওয়া যাক।

শুরুতেই মুভিটি সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য শেয়ার করছি। বিক্রম মুভির ২০২১ সালে নির্মাণ কাজ শুরু করেন লোকেশ কানাগরাজ। মুভিটি কামাল হাসান প্রযোজনা করেছেন, গত ০৩ জুন ২০২২ এ মুভিটি থিয়েটারে মুক্তি পেয়েছে। এটি লোকেশ সিনেমাটিক ইউনিভার্স (এলসিইউ) এঁর দ্বিতীয় অংশ, ২০১৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত কাইথি ছিলো প্রথম অংশে। মুভিটির বাজেট ছিলো ১৫০ কোটি রুপি, মাত্র চার দিনে ১৯৫ কোটি রুপি আয় করে ইন্ডিয়ান মুভির বক্স অফিসে কালেকশনে ঝড় তুলে দিয়েছে। ইতিমধ্যেই, বিক্রম ২ এঁর ঘোষণা মুভির শেষে পাওয়া গেছে। এ বছরের কয়েকটি সফল সাউথ ইন্ডিয়ান মুভির মতো এটিও প্যান ইন্ডিয়ায় এবং ইন্ডিয়ার বাইরেও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে।

বিক্রম মুভি রিভিউঃ লার্জার দ্যান লাইফ

প্রতি বছর হাতে গোনা কয়েকটি মুভি মুক্তি পায়, যেগুলি গুণে মানে ভালো, দর্শপ্রিয়, বক্স অফিস সফল এবং বার বার দেখতে ইচ্ছে করে। ঠিক তেমনি একটি মাস্টারপির মুভি বিক্রম। মুভিটি শুরু থেকে শেষ সবই ছিলো মনোমুগ্ধকর। ২ ঘন্টা ৫৩ মিনিটের মুভি নিমিষেই শেষ হয়ে গেলো বুঝলামই না। ক্লাইমেক্সে মনে হচ্ছিলো আর একটু চলুক, আর একটু।

এক কথায় বলতে গেলে, লার্জার দ্যান লাইফ

টাইটেল

মুভির টাইটেল মুভির অন্যতম চরিত্রকে কেন্দ্র করে রাখা। মুভিতে কামাল হাসান অভিনয় করেছেন এজেন্ট অরুণ কুমার বিক্রম চরিত্রে তার চরিত্রের নামই মুভির টাইটেল।

অভিনয়শিল্পী ও চরিত্র

  • কমল হাসান ১৯৮৭ স্কোয়াডের কমান্ডার, এজেন্ট অরুণ কুমার বিক্রমের চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
  • বিজয় সেতুপতি একজন ড্রাগ লর্ড এবং ভেটি ভ্যাগাইয়ারা গ্যাংয়ের নেতা সন্ধানম এর চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
  • ফাহাদ ফাসিল ব্ল্যাক-অপস স্কোয়াডের বর্তমান কমান্ডার, এজেন্ট অমর এর চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
  • নারাইন ইন্সপেক্টর বিজয় এর চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
  • কালিদাস জয়রাম নারকোটিক্স ব্যুরো এসিপি ও বিক্রমের ছেলে প্রভঞ্জনের এর চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
  • চেম্বান বিনোদ জোস পুলিশ প্রধান জোস এর চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
  • সন্থানা ভারতী ১৯৮৭ স্কোয়াড এজেন্ট উপ্পিলিয়াপ্পান হিসাবে ও ছদ্মবেশী জিমের মালিক এর চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
  • এলাঙ্গো কুমারভেল ১৯৮৭ স্কোয়াড – অস্ত্র বিশেষজ্ঞ, এজেন্ট লরেন্সে ও ছদ্মবেশী ক্যাব ড্রাইভার এর চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
  • বাসন্তী ১৯৮৭ স্কোয়াড – মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ এজেন্ট টিনা ও ছদ্মবেশী গৃহকর্মী কালিয়াম্মলের চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
  • গায়ত্রী শঙ্কর অমরের স্ত্রী গায়ত্রী অমর চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
  • স্বাতিষ্ঠা কৃষ্ণন প্রভঞ্জনের স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
  • জি. মারিমুথু পুলিশ কমিশনার এর চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
  • ভেটি ভাগাইয়ার সদস্য ইলাঙ্গো চরিত্রে রমেশ থিলক অভিনয় করেছেন।
  • ভেটি ভাগাইয়ার সদস্য মুন্না চরিত্রে বিনোদ অভিনয় করেছেন।
  • রুদ্র প্রতাপের চরিত্রে অরুলদোস অভিনয় করেছেন।
  • বীরপান্ডিয়ান চরিত্রে গৌথাম সুন্দররাজন অভিনয় করেছেন।
  • মায়া এস. কৃষ্ণন একজন সহকারী হিসেবে অভিনয় করেছেন।
  • ভেট্টি ভাগাইয়ার সদস্য হিসেবে সম্পাথ রাম অভিনয় করেছেন।
  • ভেট্টি ভাগাইয়ার সদস্য হিসেবে গোকুলনাথ অভিনয় করেছেন।
  • ব্ল্যাক স্কোয়াডের সদস্য হিসেবে শ্রীকুমার অভিনয় করেছেন।
  • ব্ল্যাক স্কোয়াডের সদস্য হিসেবে অরুণোদয়ন অভিনয় করেছেন।
  • ব্ল্যাক অপস স্কোয়াডের সদস্য হিসেবে অনীশ পদ্মনাভন অভিনয় করেছেন।
  • ভেটি ভাগাইয়ার সদস্য হিসেবে জাফর সাদিক অভিনয় করেছেন।
  • সন্থানামের প্রথম স্ত্রী হিসেবে মহেশ্বরী চাণক্য অভিনয় করেছেন।
  • সান্থানমের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে শিবানী নারায়ণন অভিনয় করেছেন।
  • সন্থানামের তৃতীয় স্ত্রীর চরিত্রে ময়না নন্দিনী অভিনয় করেছেন।
  • ড্রাগ ক্রাইম সিন্ডিকেটের কিংপিন, রোলেক্স চরিত্রের একটি ক্যামিওতে সুরিয়া অভিনয় করেছেন।
  • জনপ্রিয় ভিলেজ কুকিং চ্যানেল টিম নিজেদের মতো করে ক্যামিওতে ছিলেন।
  • অর্জুন দাস ক্যামিওতে ২০১৯ সালের চলচ্চিত্র, কাইথি থেকে তার আনবু চরিত্রের পুনরায় উপস্থিতি রেখেছেন।
  • হরিশ উথামান ক্যামিওতে ২০১৯ সালের চলচ্চিত্র, কাইথি থেকে তার আদাইকলম চরিত্রের পুনরায় উপস্থিতি রেখেছেন।
  • ধীনা ক্যামিওতে ২০১৯ সালের চলচ্চিত্র, কাইথি থেকে তার কামাচি চরিত্রের পুনরায় উপস্থিতি রেখেছেন।
  • হরিশ পেরাদি ২০১৯ সালের চলচ্চিত্র, কাইথি থেকে তার স্টিফেন রাজ চরিত্রের পুনরায় উপস্থিতি রেখেছেন।
  • বেবি মনিকা ক্যামিওতে ২০১৯ সালের চলচ্চিত্র, কাইথি থেকে তার আমুধা চরিত্রের পুনরায় উপস্থিতি রেখেছেন।
  • কানাগরাজের ২০১৯ সালের চলচ্চিত্র, কাইথি থেকে দিল্লি হিসেবে ভয়েজ ওভার ক্যামিও দিয়েছেন কার্তি

আমার মনে হয় না এই চরিত্র গুলির জন্য এর ভালো কাস্টিং পাওয়া যেতে পারে। যেমন দুর্দান্ত সব অভিনেতা-অভিনেত্রী তেমন পার্ফেক্ট তাদের ক্যারেক্টার স্টাবিলাইজেশন। কানাগরাজের স্টোরির চরিত্র গুলি সব সময় পরিপূর্ণ এবং বাস্তবকেন্দ্রিক দেখতে পাওয়া যায়।

অভিনয়

অভিনয় সবাই ভালো করেছেন। সবার অভিনয়ই ন্যাচারাল এবং ভালো লেগেছে। তবে সেরা কয়েকটি চরিত্রের অভিনেতাদের অভিনয় নিয়ে কিছু কথা বলা যাক।

কমল হাসানঃ ১৯৮৭ স্কোয়াডের কমান্ডার, এজেন্ট অরুণ কুমার বিক্রমের চরিত্রে অভিনয় করেছেন কমল হাসান। এই চরিত্র বিক্রম মুভির সেরা চরিত্রগুলির মধ্যে একটি। চরিত্রটা থ্রিল এবং ফাটাফাটি একশনে মজে ছিলো। কমল হাসান একদম স্কীন ফাটিয়ে দিয়েছে। এক্সপ্রেশন ডায়ালগ কোন কিছুতেই কমতি ছিলো না। তিনি যে তামিল ইন্ড্রাস্টির বস এক্টরদের মধ্যে একজন তা দেখিয়ে দিয়েছেন। ফুল অব এনার্জি, বাইক চেজ, একশন কোন কিছুতেই তার কোন কমতি পাওয়া যায় নাই। বেস্ট ক্যারেক্টার অব দ্য মুভি।

বিজয় সেতুপতিঃ একজন ড্রাগ লর্ড এবং ভেটি ভ্যাগাইয়ারা গ্যাংয়ের নেতা সন্ধানম এর চরিত্রে অভিনয় করেছেন বিজয় সেতুপতি। বিজয় সেতুপতির কথা কি আর বলবো সে একের পর এক সেরা পার্ফমেন্স দিয়েই যাচ্ছে। সেটা রোমান্টিক, একশন হিরো অথবা ভিলেন যেই চরিত্রই দেখি না কেন। কানাগরাজের রিসেন্ট মাস্টার মুভিতেও নেগেটিভ রোলে ফাটিয়ে দিয়েছে বিজয় সেতুপতি, কানাগরাজ  পার্ফেক্ট ইউজ করতে অভিনেতাকে। এই মুভিতে তার সাউথ ইন্ডিয়ান ভদ্রবেশী ভিলেন লুক, একশন এবং এক্টিং সবই ছিলো বেস্ট।

ফাহাদ ফাসিলঃ ফাহাদ ফাসিলকে নিয়েও ব্যতিক্রম কিছু বলার সুযোগ নেই। হিরো বা ভিলেন সব জায়গায় দর্শকপ্রিয়তার শীর্ষে থাকে এই মালায়লাম ইন্ড্রাস্টির জনপ্রিয় অভিনেতা। সম্প্রতি রিলিজ হওয়া পুষ্পায় তার অভিনয় নিয়ে এখনও আলোচনা শেষ হয় নাই, এর মধ্যেই দুর্দান্ত পার্ফরমেন্সের মাধ্যমে আবার মানুষের ভালোবাসা অর্জন করে নিলো ফাহাদ। ব্ল্যাক-অপস স্কোয়াডের বর্তমান কমান্ডার, এজেন্ট অমর এর চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এটিও এই মুভির সেরা একটি চরিত্র।

সুরিয়াঃ লাস্ট বাট নট লিস্ট মুভির অন্যতম এক স্যান্সেশন সুরিয়া। তার মাত্র কয়েক মিনিটের উপস্থিতি পুরো মুভির ফোকাস নড়িয়ে দিয়েছে। তার উপস্থিতি অন্যরকম এক মাত্রা যোগ করে দিয়েছে। একই সাথে পরের পার্ট অর্থাৎ বিক্রম ২ এ কি খেলা হবে তা দর্শকদের বুঝিয়ে দিয়েছে। ড্রাগ ক্রাইম সিন্ডিকেটের কিংপিন, রোলেক্স চরিত্রের একটি ক্যামিওতে সুরিয়া অভিনয় করেছেন। তার অভিনয় বরাবরেই মতো অস্থির ছিলো আর মাফিয়া লুকে বেশ লেগেছে।

গল্প

গল্প নিয়ে কথা বলতে গেলে স্পয়লার দিতে হয়, যা আমার ব্যক্তিগত ভাবে পছন্দ না। তবে গল্পটা খুবই সুন্দরভাবে সাজিয়েছেন কানাগরাজ। ফাস্ট হাফে থ্রিল আর হালকা একশনে আগালেও শেষ হাফে ফাটিয়ে দিয়েছে। কোথাও বোর লাগার মতো কোন বিষয় পাই নাই।

মেকিং

মেকিং নিয়ে বলতে গেলে অনেকের কথা এবং অনেকগুলি বিষয় নিয়ে কথা বলতে হবে। প্রথমেই বলি লোকেশ কানাগরাজের কথা তার লেখা গল্প, স্ক্রীন প্লে এবং মেকিং এ জাদু আছে। তিনি সুন্দরভাবে কাইথি মুভির সাথে এই মুভির লিংক করে গল্প টেনেছেন এবং এক্টরদেরও চমকপ্রদ ভাবে উপস্থিত করেছেন। একই সাথে, নতুন চরিত্র গুলি যুক্ত করে তাদের অভিনয়ে প্রফুল্লতা এনে দিয়েছেন। তার মেকিং ছিলো নিখুত ভুল আমার চোখে পড়ে নাই। স্মুথ সব অ্যাকশন স্ট্যান্ট, এডিটিং ছিলো চোখে পড়ার মতো। ক্যামেরা ফ্রেমিং গুলিও খুবই ভালো ছিলো।

মুভির মূলমন্ত্র হলো বিজিএম। এই মুভির বিজিএম অনিরুধের করা। অ্যাকশন থ্রিলার মুভকে প্রাণবন্ত করেছে বিজিএম। শ্রুতিমধুর বিজিএম ইতিমধ্যেই দর্শকপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সেই সাথে মুভির গানগুলিও আছে আলোচনায়। বিশেষ করে, কামাল হাসানের এন্ট্রি সং।

সর্বশেষ

লোকেশের নতুন সৃষ্টিতে মুগ্ধ দর্শক। সত্যিই লোকেশ সিনেমাটিক ইউনিভার্স (এলসিইউ) এর একটি সিনেমা। কমল হাসান, বিজয়, সুরিয়া এবং লোকেশের কাছে এমন আরও ভালো ভালো মুভি ভবিষ্যতে পাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *