,


লালবাগ কেল্লা - ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান

লালবাগ কেল্লা – ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান

আমাদের আজকের প্রতিবেদনটি লালবাগ কেল্লা কে ঘিরে। লালবাগ কেল্লা কোথায় অবস্থিত, লালবাগ কেল্লা এর ইতিহাস, লালবাগ কেল্লা এর কাঠামো, কেন যাবেন লালবাগ কেল্লা, কিভাবে যাবেন, কোথায় থাকবেন এ নিয়ে আমাদের প্রতিবেদন টি সাজানো হয়েছে। আশা করি, প্রতিবেদনটি পড়ে আপনারা উপকৃত হবেন।

লালবাগ কেল্লা, মোঘল আমলের বাংলাদেশের একমাত্র ঐতিহাসিক নিদর্শন যাতে একই সাথে ব্যবহার করা হয়েছে কষ্টি পাথর, মার্বেল পাথর আর নানান রঙবেরঙের টালি। লালবাগ কেল্লা ছাড়া আর বাংলাদেশের আর কোন ঐতিহাসিক নিদর্শনে এমন কিছুর সংমিশ্রণ পাওয়া যায়নি আজ পর্যন্ত। প্রায় প্রতিদিন হাজারো দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীর পদচারণয় মুখরিত হয় ঢাকার লালবাগ এলাকার এই দুর্গটি।  বর্তমানে সুবেদার শায়েস্তা খাঁনের বাসভবন ও দরবার হল ‘লালবাগ কেল্লা জাদুঘর’ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

নামকরণ

প্রথমে আওরঙ্গবাদ এলাকার নামের সাথে মিল রেখে কেল্লার নাম দেয়া হয়েছিল আওরঙ্গবাদ দূর্গ বা আওরঙ্গবাদ কেল্লা। ১৮৪৪ সালে আওরঙ্গবাদ এলাকাটির নাম পরিবর্তন করে লালবাগ রাখা হয়। এলাকার নামের সাথে সাথে কেল্লাটির নামও পরিবর্তিত হয়ে লালবাগ কেল্লা হিসাবে পরিচিতি লাভ করে।

লালবাগ কেল্লার অবস্থান

ঢাকার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকায় অবস্থিত।

  • জেলাঃ ঢাকা
  • উপজেলাঃ লালবাগ

ইতিহাসের পাতায় লালবাগ কেল্লা

লালবাগ কেল্লার নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৬৭৮ সালে। তৎকালীন মুঘল সম্রাট আজম শাহ এর নির্মাণ কাজ শুরু করেন। যদিও আজম শাহ খুব কম সময়ের জন্যেই মুঘল সম্রাট হিসেবে ছিলেন। তবুও তার অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তার এই অসাধারণ কাজটি শুরু করেন। উল্লেখ্য আজম শাহ ছিলেন মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব এর পুত্র আর সম্রাট শাহ জাহানের নাতি, যিনি তাজমহল তৈরির জন্যে বিশ্ব মহলে ব্যাপক সমাদৃত।

এই দুর্গ নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার প্রায় এক বছরের মাথায় তার বাবার ডাকে তাকে দিল্লিতে চলে যেতে হয় সেখানকার মারাঠা বিদ্রোহ দমন করবার জন্যে। সম্রাট আজম শাহ চলে যাওয়ার পর দুর্গ নির্মাণের কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। তখন এই দুর্গ নির্মাণের কাজ আদৌ সম্পূর্ণ হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। কিন্তু সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে তৎকালীন নবাব শায়েস্তা খাঁ পুনরায় লালবাগ কেল্লার নির্মাণ কাজ শুরু করে দেন কাজ থেমে যাওয়ার প্রায় এক বছর পরে। পুরো উদ্যমে আবার কাজ চলতে থাকে দুর্গ নির্মাণের।

তবে শায়েস্তা খাঁ পুনরায় কাজ শুরু করার প্রায় চার বছরের মাথায় দুর্গের নির্মাণ কাজ আবার বন্ধ হয়ে যায়, এরপর দুর্গটি নির্মাণের কাজ আর শুরু করা হয়নি। নবাব শায়েস্তা খাঁ এর মেয়ে পরী বিবি মারা যাওয়ার কারণেই মূলত শায়েস্তা খাঁ লালবাগ কেল্লার নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেন। পরী বিবির মৃত্যুর পরে সবার মধ্যে দুর্গটি সম্পর্কে বিদ্রূপ ধারণা জন্ম নেয়, সবাই দুর্গটিকে অপয়া ভাবতে শুরু করে দেয়।

পরী বিবির মৃত্যুর পর তাকে লালবাগ দুর্গের মাঝেই সমাহিত করা হয়, আর এরপর থেকে একে পরী বিবির সমাধি নামে আখ্যায়িত করা হয়। পরী বিবির সমাধির যে গম্বুজটি আছে তা একসময় স্বর্ণখোচিত ছিল, কিন্তু এখন আর তেমনটি নেই, তামার পাত দিয়ে পুরো গম্বুজটিকে মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

লালবাগ কেল্লা এর কাঠামো

কেল্লাতে একটি মসজিদ আছে, আজম শাহ দিল্লি চলে যাওয়ার আগেই তিনি এই মসজিদটি তৈরি করে গিয়েছিলেন। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদটি যে কারো দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম। মসজিদটিতে জামায়াতে নামায আদায় করা হয়। ঢাকায় এতো পুরনো মসজিদ খুব কমই আছে।

লালবাগ কেল্লাতে এখানে ওখানে বেশ কয়েকটি ফোয়ারার দেখা মিলবে, যা শুধুমাত্র কোনো বিশেষ দিনে চালু থাকে (যেমনঃ ঈদ)। কেল্লাতে সুরঙ্গ পথ ও আছে, লোক মুখে শোনা যায় যে আগে নাকি সুরঙ্গ পথগুলোতে যাওয়া যেতো, তবে এখন আর যাওয়া যায়না। উল্লেখ্য সুরঙ্গ পথ এ যাওয়ার কথাটি নিতান্তই শোনা কথা, এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।

লালবাগ কেল্লায় সর্বসাধারণের দেখার জন্যে একটি জাদুঘর রয়েছে, যা পূর্বে নবাব শায়েস্তা খাঁ এর বাসভবন ছিল আর এখান থেকেই তিনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। জাদুঘরটিতে দেখার মতো অনেক কিছুই রয়েছে। মুঘল আমলের বিভিন্ন হাতে আঁকা ছবির দেখা মিলবে সেখানে, যেগুলো দেখলে যে কেউ মুগ্ধ না হয়ে পারবে না। শায়েস্তা খাঁ এর ব্যবহার্য নানান জিনিসপত্র সেখানে সযত্নে রয়েছে। তাছাড়া তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র, পোশাক, সেসময়কার প্রচলিত মুদ্রা ইত্যাদিও রয়েছে।

লালবাগ কেল্লায় পরীবিবির সমাধি রয়েছে। যা মুঘল সুবেদার শায়েস্তা খানের প্রিয় কন্যা পরীবিবির সমাধি নামে পরিচিত। বাংলাদেশে এই একটি মাত্র ইমারতে মার্বেল পাথর, কষ্টি পাথর ও বিভিন্ন রং এর ফুল-পাতা সুশোভিত চাকচিক্যময় টালির সাহায্যে অভ্যন্তরীণ নয়টি কক্ষ অলংকৃত করা হয়েছে। কক্ষগুলির ছাদ কষ্টি পাথরে তৈরি। মূল সমাধি সৌধের কেন্দ্রীয় কক্ষের উপরের কৃত্রিম গম্বুজটি তামার পাত দিয়ে আচ্ছাদিত। ২০.২ মিটার বর্গাকৃতির এই সমাধিটি ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দের পুর্বে নির্মিত। তবে এখানে পরীবিবির মরদেহ বর্তমানে নেই বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

লালবাগ কেল্লা কেন যাবেন?

ভ্রমন পিপাসু মানুষ দের কে যদি এই কথা জিজ্ঞাসা করা হয়, তবে তারা এই কথা অহেতু হাসির ছলে উড়িয়ে দিবে । কারন, ভ্রমন পিপাসু মানুষদের কাছে এই কথা মূল্যহীন। তবুও বলি,

  • লালবাগ কেল্লা একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন ও জাদুঘর
  • কেন্দ্রস্থলের দরবার হল ও হাম্মাম খানা রয়েছে
  • পরীবিবির সমাধি রয়েছে
  • উত্তর পশ্চিমাংশের শাহী মসজিদ রয়েছে

লালবাগ কেল্লা অত্যন্ত মনোরম, যা আপনার মনকে প্রফুল্ল করে তুলবে

টিকেট মূল্য

সাধারণ দর্শনার্থীদের আহসান মঞ্জিল পরিদর্শন করতে জনপ্রতি ২০ টাকা দিয়ে প্রবেশ টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। প্রতিবন্ধী দর্শনার্থীদের জন্য আহসান মঞ্জিলে কোন টিকিটের প্রয়োজন হয় না। আর আগে থেকে আবেদন করলে ছাত্র-ছাত্রীরাও বিনামূল্যে আহসান মঞ্জিল জাদুঘর দেখতে পারে। নিচের ছক থেকে সকল সকল শ্রেণীর দর্শনার্থীদের টিকিটের মুল্য জেনে নিনঃ

টিকিটের শ্রেণী টিকিটের মূল্য
সাধারণ দর্শনার্থী জনপ্রতি ১০ টাকা
বিদেশী দর্শনার্থী জনপ্রতি ১০০ টাকা
অপ্রাপ্ত শিশুরা (৫ বছরের নিচে) ফ্রী

পরিদর্শনের সময়

কাল ও মাস ভেদে লালবাগ কেল্লা পরিদর্শনের সময়সূচি পরিবর্তিত হয়।

আহসান মঞ্জিল পরিদর্শন করা যায় দর্শনার্থীদের নিম্নে প্রদত্ত সময়ের মধ্যে আসতে হবে। তাই ছক দেখে সময় জেনে নিনঃ

এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাস (গ্রীষ্মকালে)

বার সময়সূচী
শনিবার থেকে বুধবার (ছুটির দিন ব্যতিত) সকাল ১০টা – বিকেল ৬টা ( দুপুর ১ঃ০০ টা – ১ঃ৩০ টা বন্ধ থাকে)
সোমবার দুপুর ২ঃ৩০ টা – বিকেল ৬ টা
শুক্রবার সকাল ১০ টা – বিকেল ৬ টা (দুপুর ১২ঃ৩০-০২ঃ০০ টা পর্যন্ত জুম্মার নামাজের জন্য বন্ধ থাকে)

অক্টোবর থেকে মার্চ (শীতকালে)

বার সময়সূচী
শনিবার থেকে বুধবার (ছুটির দিন ব্যতিত) সকাল ৯ টা – বিকেল ৫টা ( দুপুর ১ঃ০০ টা – ১ঃ৩০ টা বন্ধ থাকে)
সোমবার দুপুর ২ঃ৩০ টা – বিকেল ৫ টা
শুক্রবার সকাল ৯ টা – বিকেল ৫ টা (দুপুর ১২ঃ৩০-০২ঃ০০ টা পর্যন্ত জুম্মার নামাজের জন্য বন্ধ থাকে)

সপ্তাহের রবি ও সোমবার যথাক্রমে পূর্ণ ও অর্ধ দিবসের জন্য লালবাগ কেল্লা বন্ধ থাকে। এছাড়াও সকল বিশেষ সরকারী ছুটির দিনে লালবাগ কেল্লা বন্ধ থাকে।

লালবাগ কেল্লা কীভাবে যাবেন ?

বাসঃ শাহবাগে অবস্থিত বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সামনে থেকে লালবাগ কেল্লা পরিদর্শনের জন্য বিশেষ বাস সার্ভিস রয়েছে।

রিক্সা বা সিএনজিঃ ঢাকার নিউমার্কেট এবং গুলিস্তান থেকে ৪০ থেকে ৫০ টাকা রিক্সা ভাড়ায় সহজেই লালবাগ কেল্লায় যাওয়া যায়।

টেম্পুঃ গুলিস্তান গোলাপ শাহের মাজার থেকে মাত্র ৬ টাকা ভারায় টেম্পু দিয়ে লালবাগ কেল্লায় যাওয়া যায়।

পায়ে হেঁটেঃ আবার আপনি চাইলে সরাসরি পুরান ঢাকার সদরঘাট এলাকায় এসে পায়ে হেঁটে আহসান মঞ্জিল যেতে পারবেন।

লালবাগ কেল্লার ম্যাপে

গুগুল ম্যাপে লালবাগ কেল্লার ম্যাপ যুক্ত করা হয়েছে। যা দেখে আপনি সহজেই আপনার পথ খুজে পাবেন।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


এই বিভাগের আরো

%d bloggers like this: