,


মুমূর্ষু করতোয়াকে বাঁচাতে পদক্ষেপ জরুরি

মুমূর্ষু করতোয়াকে বাঁচাতে পদক্ষেপ জরুরি

করতোয়া নামটি দুটি বাংলা শব্দ কর বা হাত এবং তোয়া বা পানির সমন্বয়ে গঠিত । এই নামটি হিন্দু কিংবদন্তির প্রতিফলন করে । যার মতে এই নদী পার্বতীকে বিয়ে করার সময় শিবের হাতে ঢালা পানি থেকে তৈরি হয়েছিল ।

করতোয়া মূলত রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের অন্তর্গত একটি ছোট নদী ।করতোয়া এদেশের একটি প্রাচীনতম নদী ।হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই নদী পবিত্র রূপে গণ্য করা হয় ।হাজার বছরের প্রাচীনতম গ্রন্থ মহাভারতে এই নদীর কথা বলা রয়েছে । করতোয়া নদীর উৎপত্তি ভারতের পশ্চিম বঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলায়।যার জলধারা বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার ভোজনপুর ইউনিয়নের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ।এক সময় স্রোতস্বিনী, তেজস্বিনী ও খরস্রোতা নদী ছিল করতোয়া, ছিল বয়ে চলার শব্দ ।

কথিত আছে এক সময় এই নদীতে মালামাল ও পন্য আনা নেওয়ার কাজ করা হত চলত লঞ্চ, ফেরী ,স্টিমার , কালের আবর্তনে যেন সবকিছু হারিয়ে গেছে ।তার সেই চিরচেনা যৌবন এখন আর নেই ,নেই তেজ, নেই স্রোত।মানুষের দখল আর দূষণে করতোয়া যেন আজ মৃত । বগুড়ার বুক চিড়ে বয়ে যাওয়া করতোয়ার নদীর দুইপাড় অবৈধ দখল দালান কোঠা নির্মাণ কল কারখানার বর্জ্য ফেলে হারিয়ে যেতে বসেছে তার চিরচেনা যৌবন ।

করতোয়া নদীটি বিভিন্ন স্থানে নানা ভাবে বাধাগ্রস্থ হয়ে বর্তমানে মৃত রুপে টিকে আছে কোথাও চাষের জমি ,কোথাও কালভার্ট কোথাও ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠান নির্মিত হয়েছে বগুড়া শহরের বিভিন্ন স্থানের প্রায় ১০ থেকে ১৫ টন বর্জ্য ফেলার জায়গা হিসেবে ব্যাবহার করা হচ্ছে করতোয়া নদীকে এ যেন বর্জ্য ফেলার সেফটি ট্যাঙ্ক । নদীর মুখে নির্মিত বিভিন্ন দালান কোঠার জন্য বন্ধ হয়ে গেছে নদীর নাব্যতা ।

নাব্যতা ফেরাতে প্রশাসন বিভিন্ন সময় নানা উদ্যোগ নিলেও তা কখন বাস্তবায়িত হয়নি ।মাঝে মাঝে উচ্ছেদ অভিযান চালালেও কিছুদিন পর তা আবার আগের মত দখল হয়ে যায়। ১৯৮২ সালে করতোয়া নদীকে খনন এর মাধ্যমে তার গতিপথকে স্বাভাবিক প্রবাহ ধরে রাখার চেষ্টা করা হয় ।

সব শেষ ১৯৯০ সালে পুনরায় নদীটি খনন শুরু হলে পরবর্তিতে কারয্যক্রম না থাকায় নদীটি ফসলের মাঠে পরিণত হয় । বগুড়া শহরের গোরা পত্তন হয়েছে এই নদীকে কেন্দ্র করে ।বগুড়া সদরের হেড কোয়াটার রুপে পরিচিত দাপ্তরিক বড়, বড় প্রতিষ্ঠান যেমন পুলিশ প্রসাসন, সিভিল সার্জন অফিস ,বগুড়া পৌরসভা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ,বাঁজার হাট উপাসনালয় ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান, খেলার মাঠ সহ সমস্থ প্রধান কার্যালয় গড়ে উঠেছে এই নদীর তীরবর্তি অঞ্চলকে কেন্দ্র করে । কিন্তু করতোয়া নদীর প্রবাহ বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ভাবে বিগ্নিত হয়ে বর্তমানে মৃত ।

নদীর কোন কোন স্থান চাষের জন্য জমি হিসেবে ব্যাবহার করা হচ্ছে । বগুড়া শহরের মধ্যে করতোয়া নদী অপর্যাপ্ত পানি প্রবাহ ও অবৈধ দখলদারদের কবলে পড়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে একরকম বলা চলে । এই শহরের বিভিন্ন উৎস হতে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ টন বর্জ্য ফেলার ফলে যেটুকু নাব্যতা ছিল তাও হারাতে বসেছে প্রায় ১৪০ কিমি দীর্ঘ এককালের করতোয়ার ৮০ শতাংশ আজ দখলের কবলে পরে মৃত ।

বগুড়া সদরের নদীর তীরবর্তি এলাকার ভুমি আজ মানুষের নিজস্ব ভূমি হিসেবে ব্যাবহার করা হচ্ছে । নদীর অন্তর্গত বহু জায়গায় মানুষের বসত ভিটা, ইট ভাটা, বাঁজার, বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় হিসেবে ব্যাবহার হচ্ছে । যার ফলে সংকুচিত হয়ে পড়েছে নদীর দুই পার ।

এছাড়াও শহরের রাজাবাজার, ফতেহ আলী বাঁজার সংলগ্ন রেল ব্রিজের নিকটস্থ অঞ্চল কঠিন ও তরল বর্জ্য ফেলার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। করতোয়া নদীকে বাঁচাতে বগুড়ার বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক ও পরিবেশবাদী সংগঠন এবং বগুড়া বাসির দাবির মুখে ২০১৭ সালের ১৬ আগস্ট মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারিয়াকান্দি ডিগ্রী কলেজ মাঠে করতোয়া রক্ষায় “করতোয়া নদী উন্নয়ন প্রকল্প” হাতে নেওয়ার ঘোষণা দেন । যার ফলশ্রুতিতে করতোয়া নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি সহ নদীর প্রবাহ নিশ্চিত করতে পানি উন্নয়ন বোর্ড ১ হাজার ১১০ কোটি ৪৪ লাখ টাকার প্রকল্প ঘোষণা করেন।

করতোয়া নদী উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে বগুড়া ও গাইবান্ধা জেলার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত ১২৩ কিলোমিটার করতোয়া নদী পুনঃখনন । এর মধ্যে গাইবান্ধা গোবিন্দগঞ্জ অংশে ১৩ কিলোমিটার ,বগুড়া শিবগঞ্জ অংশে ৪০ কিলোমিটার সদরে ২৪ কিলোমিটার, শাহজাহানপুরে ১৭ দশমিক ৪৯ কিলোমিটার, শেরপুরে ২৪ দশমিক ৮০০ কিলোমিটার ।

প্রকল্পটিতে ৯ কিলোমিটার ৭০০ মিটার নদীর তীর প্রতিরক্ষার কাজ করার কথা বলা আছে। যার মধ্যে গোবিন্দগঞ্জ অংশে দের কিলোমিটার বগুড়ার শিবগঞ্জ অংশে দেড় কিলোমিটার বগুড়া সদরে ৬ দশমিক ৭০০ কিলোমিটার । এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে করতোয়া নদীর নাব্যাতা যেমন বৃদ্ধি পাবে তেমনি নদীর প্রবাহ নিশ্চিত হবে ।

এছাড়াও ৮ টি ওয়াটার কন্ট্রোল সুইচের মধ্য দিয়ে নদীর প্রবাহ ধরে রাখার কথা বলা আছে ।শহরের ডান ও বাম তীরে প্রতিরক্ষা কাজ করার কথা বলা হয়েছে এবং নদীর শহর এলাকায় আরমারিং এর মাধ্যমে সৌন্দর্য বর্ধন এবং শহরের মধ্যে ১০ কিমি ৬০০ মিটার ওয়াক ওয়ে নির্মাণ করার কথা বলা আছে ।

যেখানে বিকাল বেলা বিভিন্ন বয়সের মানুষ হাঁটাহাঁটি বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবে ।যার মাধ্যমে করতোয়াকে অবৈধ দখল হতে রক্ষা করা যাবে, তেমনি এখানে প্রাকৃতিক পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে নদীর হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে । তাই করতোয়া নদীকে বাঁচাতে দল, মত ,শ্রেণী ,পেশা নির্বিশেষে এগিয়ে আসা উচিত। ভবিষ্যৎ প্রজন্মর জন্য নদীকে বাঁচাতে হবে।

তাই করোতোয়াকে অবৈধ দখল মুক্ত করে এর নাব্যতা ফিরে আনতে সরকারের উদ্যোগ জরুরি। আমরা আশা করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া প্রতিশ্রুত “করতোয়া নদী উন্নয়ন প্রকল্প” দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার এ নদীকে বাঁচাতে দ্রুত পদক্ষেপ নেবে কারণ নদী বাঁচলে ,দেশ বাঁচবে, বাঁচবে দেশের জীব বৈচিত্র।

মোঃ আল আমিন নাহিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


এই বিভাগের আরো

সর্বশেষ

বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) আপডেট

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
৩৮,২৯২
সুস্থ
৭,৯২৫
মৃত্যু
৫৪৪

বিশ্বে

আক্রান্ত
৫,৭২২,৬৪৩
সুস্থ
২,৪৫৭,৯৬০
মৃত্যু
৩৫৩,৫৮০

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) আপডেট

সর্বশেষ (গত ২৪ ঘন্টার রিপোর্ট)
আক্রান্ত
মৃত্যু
সুস্থ
পরীক্ষা
১,৫৪১
২২
৩৪৬
৬,২২২
সর্বমোট
৩৮,২৯২
৫৪৪
৭,৯২৫
২৫৯,২৫৬
%d bloggers like this: