,


গ্রাম থেকে উঠে আসা বেনাপোল কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার শাকিলা পারভীন একজন সততার দৃস্টান্ত স্থাপনকারী নারী : জীবন সংগ্রামে হারতে শেখেনি সে

গ্রাম থেকে উঠে আসা বেনাপোল কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার শাকিলা পারভীন একজন সততার দৃস্টান্ত স্থাপনকারী নারী : জীবন সংগ্রামে হারতে শেখেনি সে

বেনাপোল প্রতিনিধিঃ দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল কাস্টম হাউসে নিষ্ঠা,সততা ও দক্ষতার সাথে একজন মহীয়সী নারী, যুগ্ম কমিশনারের মত একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। কর্মজীবন সংগ্রামে জয়ী হওয়া দায়িত্বশীল এই নারীর নাম শাকিলা পারভীন। তার বিনয়ী ,সততা আর দক্ষতায় মুগ্ধ হয়েছেন গোটা কাস্টমস পরিবার, তার সুন্দর ব্যবহার , সততা ও ন্যায় বিচার অনন্য দৃস্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি। মুগ্ধ হয়েছেন সর্ব¯তরের ব্যবসায়ী মহল। কর্মক্ষেত্রে তার অফিস কক্ষে যেতে পূর্বানুমতি লাগে না দর্শনার্থীদের। ন্যায় বিচারের জন্য সবসময় উন্মুক্ত থাকে তার দরজা।

কাস্টমস এ চাকুরী করে সৎ জীবন যাপনের একটা বড় চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন তিনি। কাস্টমস এর চাহিদা মোতাবেক ডকুমেন্টস থাকলেই কোন রকম হয়রানী ছাড়াই দ্রুত পন্য খালাশ নিশ্চিত হয়।সম্প্রতি বেনাপোল কাস্টমস হাউজ পরিবার তার সততা ও দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে তাকে সংবর্ধনা দিয়েছে।

মোছা: শাকিলা পারভীন। সবাই ডাকে শান্তনু বলে। পাবনা জেলার চাটমোহর থানায় তার জন্ম। অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার বাবা এবং গৃহিণী মায়ের প্রথম সন্তান তিনি। দুই ভাই-বোনের মধ্যে তার ছোট্ট ভাই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে ৩৭তম বিসিএস এর মাধ্যমে সুপারিশপ্রাপ্ত একজন ডাক্তার।

শান্তনু জানান, মফস্বল শহরের একটি সাধারণ পরিবারের মেয়ে আমি। অন্য দশটা সাধারণ মেয়ের মতই স্বপ্ন দেখার অবাধ স্বাধীনতা কখনই ছিলো না আমার। চাটমোহর শালিখা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা এবং স্থানীয় পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে ঢাকায় চলে আসি। ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এইচএসসি পাস করার পর ভর্তি হই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। এ বিভাগ থেকেই ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সসহ মাস্টার্স সম্পন্ন করেছি ২০০৭ সালে।

তারপর বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে যোগদানের পর অস্ট্রেলিয়া অ্যাওয়ার্ড স্কলারশীপ নিয়ে-২০১৪-২০১৬ পর্যন্ত দি ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্ন থেকে আরও একটি মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেছি পাবলিক পলিসি এন্ড ম্যানেজমেন্ট কোর্সের উপর। একটি মধ্যবিত্ত সাধারণ পরিবারের মেয়ে হিসেবে শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘ এ পথ চলার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিলো যেন এক একটা যুদ্ধজয়ের ইতিহাস।

জন্মের পর মফস্বল শহরে বাস করেও আমার মনে হতো যেন এই শহরই তো সবচেয়ে বেশি আলোকিত। এখানে আছেন সরকারি কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের একজন ইউএনওসহ বেশ কিছু গেজেটেড অফিসার। প্রায় তাদের কাছে যেতে হতো কাগজপত্র সত্যায়িত করতে। সেখান থেকেই আসলে আমার স্বপ্ন দেখা শুরু। সাধারণ পরিবারের একজন মেয়ের এ স্বপ্ন যেন স্বপ্নই মনে হতো। কিন্তু না সাহসিকতার সাথে প্রতিটি দিনই আমার জন্য এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার একটি অসাধারণ দিন ছিল।

১৯৯৯ সালে আমি যখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছি ঠিক সেই সময় অসুস্থ হয়ে পড়লেন বাবা। বাবার অবস্থা এতটাই খারাপ ছিলো যে পরিবার-পরিজনসহ প্রতিবেশীরা বাবার বেঁচে থাকার হাল ছেড়ে দিলেন। এ অবস্থায় এইচএসসি পাসের যোগ্যতা নিয়েই আমি চাকরি খুঁজতে শুরু করি। কারণ পুরো সংসারের দায়িত্বই তো এখন আমাকে নিতে হবে। কষ্টের সেই দিনগুলোর মাঝেই পরীক্ষা দিয়েছিলাম প্রাইমারি স্কুলের সহকারী শিক্ষক পদে। চাকরিটা হয়েও গেল। আর শুরু হলো সমাজের লোকদের কথিত নীতিকথা। বলতে লাগলো মেয়েকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়ে কি হবে। প্রাইমারিতে যখন চাকরি পেয়েছে তখন বিয়ের কাজটা সম্পন্ন করা ভালো। তাছাড়া প্রাইমারি মাস্টার মেয়েদের জন্য ছেলের তো অভাব নেই। অসুস্থ বাবাকেও সমাজের মানুষগুলো তাদের মতাদর্শী করে নিলো। এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির সুযোগ যখন ফাইনাল হলো- তখন চাকরি ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে চাইলাম। সবাই বাধা দিলো তখন, পড়তে যাওয়া যাবে না। ঠিক সেই সময় আমার অসুস্থ বাবাকে দেখতে আসা আমার প্রিয় মামা বাবাকে বুঝালেন, বাবাও বুঝলেন, শেষঅবধি চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে চলে গেলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে পড়ার সময় আমার সেই ছোট্ট বেলার স্বপ্ন হূদয়ের গভীরে জেগে ওঠে। আমি হবো প্রজাতন্তের একজন সৎ গেজেটেড অফিসার। শুরু হলো আমার জীবন সংগ্রাম। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পুরোটাই আমার পার হলো টিউশনি আর কোচিং করে। তাছাড়া ইংরেজি সাহিত্যের লেকচারার হিসেবে পড়িয়েছি একটি বেসরকারি কলেজে।

২০০৯ সালের অক্টোবর মাসে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক পদে যোগদান করে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করেছি। পরে আমার স্বপ্ন পূরণ হয় ২৮তম বিসিএস এর মাধ্যমে। ২০১০ সালের ১লা ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দিয়ে যোগদান করি কাস্টমস ডিপার্টমেন্টের সহকারী কমিশনার হিসেবে। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী হিসেবে বিসিএসে সব সময় আমার প্রথম পছন্দ ছিলো ফরেন অ্যাফেসার্স ক্যাডার।

পরবর্তীতে আমার প্রথম পছন্দ প্রাপ্তির আশায় ২৯তম বিসিএস এর ভাইভায় অবতীর্ণ হই। সেবারও আমি মনোনীত হই কাস্টমস্ ক্যাডারে। সেই মুহূর্তে একটু কষ্ট পেলেও পরবর্তীতে কাস্টমস্ বিভাগের কাজের ধরন, সরকারের রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন, সরকারের বাৎসরিক বাজেটের সার্বিক কর্মকান্ডে মূল ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালনসহ পোষ্টিং, প্রোমশনের ক্ষেত্রে এই বিভাগের আশাব্যঞ্জক অবস্থানের কারণে ভালোবেসে ফেলেছি কাস্টমস বিভাগে আমার উপর অর্পিত দায়িত্বকে। দেশ আমাকে অনেক দিয়েছে। তাই দেশের জন্য দেশের মানুষের জন্য সততার সাথে ভালো কিছু করাই আমার মুখ্য উদ্দেশ্য।

নারী হিসেবে একজন মা হিসেবে এই কর্মক্ষেত্রে যোগদানের পর কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হইনি। আমার স্বামী বাংলাদেশ পুলিশের একজন এডিশনাল কমিশনার হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। আমার আড়াই বছরের একটি কন্যা সšতান আছে। আমার কর্মক্ষেত্রের প্রতিটি পর্যায়েই আমি আমার স্বামীর সহযোগিতা পেয়ে আসছি।

দেশের ও দেশের মানুষের জন্য কিছু ভাবতে বা করতে চাইলে সততার কোনো বিকল্প নেই। একজন নারীই কিন্তু একজন মা। তাই একজন মা কখনই অসৎ হয়ে দেশকে কিছু দিেেত পারে না। আমি আমার কর্মক্ষেত্রে প্রতিটি সহকর্মী বিশেষ করে নারী সহকর্মীদের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হতে চাই।

আমরা নারী হলেও ঠিক আর দশজন সরকারি কর্মকর্তার মতই দেশকে এগিয়ে নিতে অগ্রনী ভূমিকা রাখতে চাই। সৎ থেকে দেশের উন্নয়নে অংশ গ্রহন মুলক ভুমিকা নেয়া যায় এই বার্তা পৌঁছে দিতে চাই প্রতিটি নারীর কাছে। আমি ছোট্ট বেলা থেকেই প্রতিটি দিনকে তৈরি করেছি নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আর আমার মা ও বাবা আমাকে সার্বক্ষণিক সাহস দিয়েছেন সাফল্যের চুড়ায় উঠতে।

গ্রাম থেকে উঠে আসা একজন সংগ্রামী নারীকে অনুসরন করে সমাজের আর দশটা নারী এগিয়ে আসবে দেশ সেবার এমনটি প্রত্যাশা সকলের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


এই বিভাগের আরো

%d bloggers like this: