,


কুড়িগ্রামের বানভাসী মানুষদের নৌকাই এখন ভরসা

কুড়িগ্রামের বানভাসী মানুষদের নৌকাই এখন ভরসা

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধিঃ ‘বাড়ির ভিতরা কমর পানি। চকি ডুবি গেইছে। মালামাল সউগ ভিজি গেইছে। দিন-রাইত বাচ্চা নিয়া নৌকার উপরা বসি থাকি। আলগা চুলায় একবেলা রান্না করি। প্রসাব-পায়খানা তাও নৌকার ওপর বসি করা খায়। যে বান আইচ্ছে বাহে। এ্যালা নৌকাই হামার ভরসা।’
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার চর ঘনশ্যামপুরের বাসিন্দা কোরবান আলী তাঁর দুরবস্থার কথা বর্ণনা করছিলেন এভাবে।
দূর থেকে একটি নৌকা দেখে লগি দ্রুত ঠেলে ঠেলে কাছে এলেন কোরবান। সঙ্গে স্ত্রী, সন্তান ও প্রতিবেশী একজনের পরিবারও রয়েছে। হয়তো ভেবেছিলেন ত্রাণের নৌকা। কিন্তু কাছে এসে অনেকটা হতাশ হলেন। নৌকার ওপর আলগা চুলা। তাও বৃষ্টিতে ভিজে একশা! এই চুলায় খড়ি জ্বলবে কি না সন্দেহ।
নৌকায় থাকা বৃদ্ধ জৈমুদ্দিন ক্ষুধায় কাতর। সকাল থেকে পেটে দানা-পানি পড়েনি। কারো কথা ভাল্লাগছে না তাঁর। অনেকটা বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘তোমাক দুঃখের কতা কয়া কী হইবে। হামার পেটোত ভোগ। দুই কেজি চাইলতো দিবার নন।’
নৌকায় থাকা পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী সুমি ভেজা কাপড়ে বসে আছে। জানায়, ১০ দিন ধরে স্কুলে যেতে পারছে না। কবে যাবে, জানে না তাও। ঠিকমতো নাওয়া-খাওয়া না হওয়ায় চেহারা মলিন।
কোরবান আলীর বাড়ির পাশের সবকটি বাড়ি ডুবে আছে। বেশির ভাগ বাড়িতে লোকজন নেই। টিনের চালটুকু জেগে আছে। আর সব পানির নিচে। ঘরের ধান-চালসহ প্রয়োজনীয় আসবাব সব ভিজে গেছে। অনেকটা জীবন নিয়ে অনেকেই যাত্রাপুরের দিকে চলে গেছে। যাত্রাপুরের সিডির মোড় থেকে এক কিলোমিটার উত্তরে মাদরাসা পর্যন্ত জায়গাটুকু শুকনো আছে। বাকি সব ডুবে আছে। এমনকি কুড়িগ্রাম-যাত্রাপুর সড়কে এখন কোমর পানি। বেশির ভাগ স্কুল ডুবে আছে। দু-একটি জেগে থাকায় গরু-বাছুর নিয়ে হাজারো মানুষ সেখানে আশ্রয় নিয়ে আছে।
নৌকায় যেতে যেতে দক্ষিণের দিকে আরো কিছু ডুবন্ত বাড়ি দেখে এগোতেই চোখে পড়ল দুই ঘরের ফাঁক গলিয়ে নৌকা বেয়ে আসছে একটি পরিবার। লগি হাতে গৃহকর্তা তজিবর আলী। স্ত্রী শিউলী আর ছোট দুটি সন্তান। বাড়ির ভেতরের উঠানে নৌকার ওপর বসে ছিলেন। ইঞ্জিনচালিত নৌকার শব্দে বেরিয়ে এলেন। এত কষ্ট করে থাকার চেয়ে উঁচু জায়গায় কেন যাননি? জিজ্ঞেস করলে তজিবরের জবাব ‘কোনটে যামো? শুকান জাগা দেখানতো দেখি। চাইরোপাকে খালি পানি আর পানি। বাধ্য হয়য়া নৌকাত বসি থাকি।’ তজিবর জানান, এ পর্যন্ত কোনো জনপ্রতিনিধি তাদের খবর নেয়নি। দেয়নি কোনো ত্রাণ সহায়তা।
ধল পাহারা দেওয়ার জন্য মূলত ঝুঁকি নিয়ে বাড়িতে পড়ে আছে। অন্যদের উপায় নেই বলে চলে গেছে।
আবার যাদের গরু-বাছুর আছে, তারাও শুকনো জায়গায় চলে গেছে। যাত্রাপুরের ইউপি সদস্য রহিমুদ্দিন রিপন জানান, নৌকা সংকটের কারণে অনেককে উদ্ধার করা যাচ্ছে না। শুকনা জায়গার অভাবে রান্নাও করা যাচ্ছে না।

যাত্রাপুর ইউপি চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী জানান, এই ইউনিয়নে ছয় হাজার ২০০ পরিবার পানিবন্দি থাকলেও সরকারিভাবে এখন পর্যন্ত এক হাজার ৫০০ পরিবারকে ১০ কেজি করে চাল দেওয়া সম্ভব হয়েছে। বাকিদের কেউ কেউ শুকনো খাবার পেয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


এই বিভাগের আরো

%d bloggers like this: