,


‘আম্মু ট্রেনের নিচে আটকে ছিল...’
‘আম্মু ট্রেনের নিচে আটকে ছিল...’

‘আম্মু ট্রেনের নিচে আটকে ছিল…’

ডেস্ক রিপোর্টারঃ মা মনোয়ারা পারভীনের মৃত্যুর সময় তিনি ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী। তাই ঘটনাটি জানার জন্য তাঁর দিকেই ভিড় করেন সাংবাদিকেরা। তবে সাংবাদিক দেখে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলেন। চিৎকার করে বলতে লাগলেন, ‘আপনাদের সঙ্গে আমি কোনো কথা বলব না। কোথায় ছিলেন আপনারা, যখন আম্মু ট্রেনের নিচে আটকে ছিল?’

গতকাল রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বরমচাল এলাকায় রেলপথের একটি কালভার্ট ভেঙে উপবন এক্সপ্রেসের পাঁচটি বগি পড়ে যায়। এ দুর্ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে একজন মনোয়ারা পারভীন। সাংবাদিকসহ লোকজনের প্রতি যিনি ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন, তিনি মনোয়ারা পারভীনের দ্বিতীয় সন্তান রোকসানা পারভীন।

রোকসানা আর্তনাদ করে বলেই যাচ্ছিলেন, ‘এখন আসছেন ছবি তুলতে, বক্তব্য নিতে! কাল রাতে কোথায় ছিলেন? আম্মু যখন ট্রেনের নিচে আটকে পড়ল, তখন কতজনের হাতে–পায়ে ধরে বলেছি, হেল্প মি, হেল্প মি। কেউ এগিয়ে এল না। বরং তারা সেলফি তোলা শুরু করল। লাইভ শুরু করল। তামাশা শুরু করল। আমি আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে চাই না। প্লিজ, আমাকে বিরক্ত করবেন না।’

মায়ের জন্য বুকভাঙা আর্তনাদ করা রোকসানাকে তখন জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন বড় বোন ইশরাত আরা। তাঁরা বিলাপ করছিলেন, ‘আল্লাহ আমাদের আম্মুকে নিয়ে গেছেন, আমরা কারও সঙ্গে কথা বলতে চাই না।’ তাঁদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন স্বজনেরা।

ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত তিন নারী ও এক পুরুষের মধ্যে মধ্যরাতে প্রথম মনোয়ারা পারভীনের (৪৫) লাশই শনাক্ত হয়। পরে সকালে শনাক্ত হয় সিলেটের মোগলা বাহার থানার আবদুল্লাহপুর গ্রামের ফাহমিদা ইয়াসমিন ওরফে ইভার (২০) লাশ। ফাহমিদা সিলেট নার্সিং ইনস্টিটিউটের বিএসএসি নার্সিং কোর্সের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন।

মনোয়ারা পারভীন কুলাউড়া উপজেলার কাদিপুর ইউনিয়নের গুপ্ত গ্রামের বাসিন্দা আবদুল বারীর স্ত্রী। আবদুল বারী আওয়ামী লীগের কুলাউড়া উপজেলা কমিটির সদস্য। সপরিবারে থাকেন কুলাউড়া পৌর শহরের ইউটিডিসি এলাকায় নিজেদের বাড়িতে।

বারী-মনোয়ারা দম্পতির দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে ইশরাত আরার বিয়ে হয়েছে সিলেট নগরে। আরেক মেয়ে রোকসানা পারভীন কুলাউড়া পৌর শহরে অবস্থিত ইয়াকুব-তাজুল মহিলা ডিগ্রি কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। ছোট ছেলে শাহরিয়ার আহমেদ এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন। সিলেট শহরে একটি মেসে থেকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কোচিং করছেন।

আবদুল বারী জানান, গত শুক্রবার স্ত্রী মনোয়ারা মেয়ে রোকসানাকে নিয়ে সিলেট শহরে বড় মেয়ে ইশরাতের বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। গতকাল রাতে ছেলে শাহরিয়ার তাঁদের উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনে তুলে দেন। রাত পৌনে ১২টার দিকে রোকসানা তাঁকে ফোন করে বলেন, ‘আব্বু, ট্রেন অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। আম্মু মনে হয় বেঁচে নেই।’ খবর পেয়ে তিনি কয়েকজন আত্মীয়কে নিয়ে ঘটনাস্থলের দিকে রওনা দেন। সেখানে গিয়ে দেখেন, দুর্ঘটনার কাছাকাছি একটি বাড়িতে মেয়ে রোকসানাকে স্থানীয় লোকজন নিয়ে রেখেছেন। মেয়ে কাঁদছেন। লোকজন তাঁকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আছে জেনে তিনি সেখানে চলে যান। দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে তিনি স্ত্রীর লাশ শনাক্ত করেন।

আবদুল বারী জানান, মনোয়ারার লাশ আজ বাদ আসর গ্রামের বাড়িতে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


এই বিভাগের আরো

%d bloggers like this: