,


আট কোপের দাগ রিফাতের শরীরে, ১২ জনকে আসামি করে মামলা

আট কোপের দাগ রিফাতের শরীরে, ১২ জনকে আসামি করে মামলা

ডেস্ক রিপোর্টারঃ দুই পাশে দুইজন। হাতে তাদের লম্বা রাম দা। মাঝে ফেলে একজনকে তারা কোপাচ্ছে। ইচ্ছা মতো। এক নারী দৌড়ে এসে ঘাতকদের ঠেকাচ্ছেন। কিন্তু পারছেন না। এলোপাতাড়ি কুপিয়ে যাচ্ছে তারা। দিনের আলোয় প্রকাশ্যে রাস্তার ওপর যখন এমন পৈশাচিক ঘটনা ঘটছে, তখন চার পাশ ঘিরে আছে আরও বেশ কয়েকজন যুবক। পথচারীরাও দেখে দৌড়ে পালাচ্ছিল। আর এই পুরো ঘটনাটি ভিডিও হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। যাদের চোখের সামনে এই ভিডিও পড়েছে, তারাই দেখেছে। দেখে আঁতকে উঠেছে। এও কি সম্ভব! মানুষ ভয়ে কাঁপছিল ভিডিওটি দেখে। আর যাদের দেখে মানুষ কাঁপছিল সেই ঘাতকেরা কারা? এমন প্রশ্নই ছিল গতকাল সর্বমহলে। রক্তাক্ত সেই যুবকটিকে আর বাঁচানো যায়নি। গত বুধবার বরগুনার এই ঘটনাটি দেশ ছাপিয়ে বিদেশেও আলোচিত হয়। ক্ষুব্ধ হয়েছেন প্রবাসী বাঙালিরাও। খুনিদের বিচারের দাবিতে ফুঁসে ওঠে দেশ। প্রকাশ্য দিবালোকে নৃশংস এই হত্যাকান্ডে র শিকার হন ডিস ব্যবসায়ী শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফ (২৫)। গতকাল লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে। মেডিকেল কলেজের সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জামিল হোসেনকে প্রধান করে গঠিত ৩ সদস্যের কমিটি তার লাশের ময়নাতদন্ত করেন। কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক ডা. সোহেলী আক্তার তন্নী এবং ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের আরেক প্রভাষক ডা. মাইদুল ইসলাম। মর্গে ময়না তদন্ত শেষে কমিটির প্রধান ডা. জামিল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, রিফাতের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের একাধিক কোপের চিহ্ন রয়েছে। এর মধ্যে তার ঘাড়ে এবং মাথায় ৩টি ক্ষত গুরুতর। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই রিফাতের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন ময়নাতদন্ত বোর্ডের প্রধান ডা. জামিল।

বরগুনার রিফাতের হত্যাকারীরা কি হঠাৎ করেই দুর্ধর্ষ হয়ে উঠেছে, নাকি আগেও অপরাধের সঙ্গে সখ্য ছিল তাদের। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে তাদের অপকর্মের নানা খতিয়ান। ছিনতাই, মাদক, হামলাসহ নানা অপকর্মের হোতা এই দুই খুনি। স্থানীয় ও পুলিশ সূত্র বলছে, হত্যাকারী দুজনের একজন রিফাত ফরাজী, আরেকজন নয়ন বন্ড। দুজনই অনেক আগে থেকেই অপরাধ জগতের পরিচিত মুখ। তাদের কারণে এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ। ‘কচু গাছ কাটতে কাটতে ডাকাত’ বনে যাওয়ার মতো ছিঁচকে চুরি আর ছিনতাইয়ের মধ্য দিয়ে শীর্ষ সন্ত্রাসীতে পরিণত হয়েছে বরগুনার সাব্বির হোসেন নয়ন। দলীয় কোনো পদ-পদবি না থাকলেও সরকারি দলের ছত্রছায়ায় থেকে ছিঁচকে চোর থেকে বরগুনার শীর্ষ সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ীতে পরিণত হয়েছে সে। মাদক বিক্রির পাশাপাশি পৌর শহরের বিকেবি রোডের ধানসিঁড়ি এলাকার নিজ বাসায় মাদকসেবীদের মাদক সেবনের সুযোগও করে দিত সে। সুবিধা পাওয়ায় মাদকসেবীরাও ভিড়ত তার কাছে। এভাবে ধীরে ধীরে বরগুনা শহরের মাদকের ডন বনে যায় সে। নিজের বাসা মাদকের আখড়ায় পরিণত করে সে। প্রায় এক বছর আগে তার ওই বাসা থেকে অন্তত ১৫ লাখ টাকা মূল্যের ইয়াবা এবং দেশি ধারালো অস্ত্রসহ সাব্বির হোসেন নয়নকে গ্রেফতার করে বরগুনা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। কিন্তু কিছুদিন পরই জামিনে ছাড়া পেয়ে ফের মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ে সে। মাদক ব্যবসার পাশাপাশি এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্য একটি বিশাল বাহিনী গড়ে তোলে সে। এই বাহিনী মাদক বিক্রিসহ এলাকায় চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মে জড়িত। কোনো রাজনৈতিক পদে না থেকেও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে চলাফেরা করায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে নয়ন। এরই ধারাবাহিকতায় গত বুধবার প্রকাশ্য দিবালোকে যুবলীগ কর্মী ডিস ব্যবসায়ী শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করে নয়ন ও তার সহযোগীরা। দূর থেকে এই দৃশ্য কে বা কারা ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিলে মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। নয়নের কোপানোর দৃশ্য দেখলে যে কেউ আঁতকে যাবেন, শরীর শিহরে উঠবে। বরগুনা পৌর শহরের একাধিক ব্যক্তি নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, পৌর শহরের বিকেবি রোডের শহরের ধানসিঁড়ি এলাকার আবু বক্কর সিদ্দিকির ছেলে নয়ন মাদকাসক্ত। কয়েক বছর আগে মাদক সেবনের টাকা যোগাড় করার জন্য সে ছিঁচকে চুরি আর মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের মাধ্যমে অপরাধ জগতে প্রবেশ করে। এক পর্যায়ে সে শুরু করে ইয়াবার ব্যবসা। নিজ বাসা মাদক সেবনের বড় আখড়ায় পরিণত করে সে। চুরি আর ছিনতাই ছাড়াও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বাকিতে সদাই বিক্রি করতে রাজি না হওয়ায় ১ বছর আগে বিকেবি রোডের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী নয়া মিয়ার পা ভেঙে দেয় সে। প্রায় একই সময়ে নয়নকে তার বাসা থেকে প্রায় ১৫ লাখ টাকা মূল্যের ইয়াবা এবং দেশীয় ধারালো অস্ত্রসহ গ্রেফতার করে বরগুনা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। এই মামলায় কিছুদিন কারান্তরীণ থাকার পর জামিনে মুক্তি পেয়ে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে নয়ন। কোনো রাজনৈতিক পদ-পদবি না থাকলেও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি সাবেক এমপি ও বর্তমান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসেনের ভায়রার ছেলে ছাত্রলীগ নামধারী রিফাত ও রিশানদের সঙ্গে চলাফেরা করায় কাউকেই পরোয়া করছিল না নয়ন। এমনকি দেলোয়ার হোসেনের বাসায় মাঝে মধ্যে কাজকর্ম করে নয়ন নিজেকে আওয়ামী লীগ প্রমাণের চেষ্টা করে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে বরগুনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি মো. দেলোয়ার হোসেন নয়ন কিংবা রিফাত-রিশানদের কোনো ধরনের প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তারা তার ভায়রার ছেলেদের পরিচয় দেন না। রিফাইত্যা শালায় (গালি) দুনিয়ার খারাপ। ও নেশা করে ছিনতাই করে। ওদের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। তার একটি মাত্র মেয়ে। এর বাইরে তার কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই। গত বছর ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি এই বার্তা বরগুনায় প্রচার করেছেন। সুতরাং নয়ন, রিফাত, রিশানকে প্রশ্রয় দেওয়ার প্রশ্নই আসে না বলে দাবি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের। সারা বরগুনার মানুষ নয়নকে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী আর চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজিতে অভিযুক্ত করেছে। তাহলে পুলিশ এত দিন তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিয়েছে জানতে চাইলে বরগুনা সদর থানার ওসি আবির মোহাম্মদ হোসেন বলেন, সে যখনই কোনো অপরাধ করেছে, পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু কিছুদিন পর জামিনে বের হয়ে এসে সে ফের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তার বিরুদ্ধে মাদক, চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে ১০টির অধিক মামলা রয়েছে বলে দাবি করেছেন বরগুনা সদর থানার ওসি। গত বুধবার শাহনেওয়াজ রিফাত শরীফ হত্যার ঘটনায় গতকাল তার বাবা মো. আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বাদী হয়ে ১২ জনের নামোল্লেখ এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৫/৬ জনকে আসামি করে বরগুনা সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। নয়ন, রিফাত, রিশান ছাড়াও এই মামলার এজাহারনামীয় অন্যান্য আসামিরা হলো চন্দন (গ্রেফতারকৃত), মো. মুসা, রাব্বী আকন, মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত, রায়হান, মো. হাসান (গ্রেফতারকৃত), রিফাত, অলি ও টিকটক হৃদয়। এরা সবাই ছাত্রলীগ নামধারী এবং ছাত্রলীগ পরিচয়ে তারা পুরো বরগুনা দাপিয়ে বেড়ায় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তবে উল্লিখিতরা ছাত্রলীগের কেউ নয় এবং ছাত্রলীগের কোনো পর্যায়ে তাদের নাম নেই বলে দাবি করেছেন বরগুনা জেলা ছাত্রলীগ সভাপতি রুবায়েত আদনান অনিক। বরগুনার পুলিশ সুপার মারুফ হোসেনের কাছে নয়নের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দিনরাত রিফাত হত্যাকা নিয়ে কাজ করছেন। রিফাত হত্যার ঘটনায় ইতোমধ্যে মামলার এজাহারনামীয় ৪ নম্বর আসামি চন্দন ও ৯ নম্বর আসামি মো. হাসানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্য আসামিদের দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে জানান বরগুনার পুলিশ সুপার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


এই বিভাগের আরো

%d bloggers like this: